কীভাবে স্থানীয় বাজারে ভেজাল ইঞ্জিন অয়েল ও স্পেয়ার পার্টস শনাক্ত করবেন

বাংলাদেশে যানজট যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে মোটরসাইকেল ও গাড়ির ব্যবহার। এর সাথে স্থানীয় বাজারে বিভিন্ন মোটরযানের ইঞ্জিন অয়েল এবং স্পেয়ার পার্টসের ব্যবসা গড়ে উঠেছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি নকল ও ভেজাল ইঞ্জিন অয়েল এবং স্পেয়ার পার্টসে স্থানীয় বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। ইঞ্জিন অয়েল, ইঞ্জিনের লুব্রিকেশনের জন্য প্রয়োজন এবং বিভিন্ন স্পেয়ার পার্টস মোটরযানের ফাঙ্কশন ঠিক রাখে এবং নিরাপত্তা বাড়ায়।
বাংলাদেশে মোটুল, মোবিল, লিকুই মলি, ইত্যাদি বিভিন্ন প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের ইঞ্জিন অয়েল এবং স্পেয়ার পার্টস পাওয়া যায়। স্থানীয় বাজার বড় ব্র্যান্ডের মতো দেখতে নকল পণ্য দিয়ে ভরে গেছে। একজন গ্রাহকের অবশ্যই বিভিন্ন গ্রেডের ইঞ্জিন অয়েল ও স্পেয়ার পার্টস সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা উচিত। এই ব্লগে কীভাবে স্থানীয় বাজারে ভেজাল ইঞ্জিন অয়েল ও নকল স্পেয়ার পার্টস শনাক্ত করবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
স্থানীয় বাজারে নকল ইঞ্জিন অয়েল ও স্পেয়ার পার্টস চেনার উপায়
ভেজাল বা নিম্নমানের তেল ব্যবহারে ইঞ্জিনে অতিরিক্ত ঘর্ষণে কার্বন জমা হয়, এবং পিস্টন জ্যাম হয়ে যায়। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ে, আবার মাইলেজও কমতে থাকে। নকল স্পেয়ার পার্টস, যেমন, ভুয়া ব্রেক প্যাড, ফিল্টার, ক্র্যাঙ্কশ্যাফট, ক্যামশ্যাফট, গিয়ারবক্স, ক্লাচ প্লেট, ব্যাটারি, সেন্সর, লাইট, ইন্ডিকেটর, ইত্যাদি জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। প্যাকেজিং, হলোগ্রাম, কিউআর কোড, গন্ধ, এবং রং, দেখে আপনি ভেজাল পণ্য চিনতে পারবেন।
লোকাল মার্কেটে নকল ইঞ্জিন অয়েল সনাক্ত করার কৌশল
ইঞ্জিন অয়েল, ইঞ্জিন অতিরিক্ত গরম হওয়া থেকে রক্ষা করে। মোটরযানের ইঞ্জিন পারফরম্যান্স নির্ভর করে ভালো মানের ইঞ্জিন অয়েলের উপর। ভেজাল ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার করলে ইঞ্জিন এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রেগুলার নিম্নমানের ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার করলে ইঞ্জিন দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মাইলেজ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়।
১. প্যাকেজিং, লেবেলিং এবং প্রিন্টিং চেক করুন
আসল ইঞ্জিন অয়েলের প্যাকেজিং, লেবেলিং এবং প্রিন্টিং উচ্চমানের হয়। লোগো এবং প্রিন্টিং অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সঠিক বানানযুক্ত থাকে। বোতলের প্লাস্টিকের মানও উন্নতমানের হয়। ভেজাল মিশ্রিত থাকলে অয়েল দেখতে গাঢ় রঙের হতে পারে।
২. লোগো, হলোগ্রাম, এবং সিল চেক করুন
প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের ইঞ্জিন অয়েল কোম্পানিগুলো ইউনিক হলোগ্রাম স্টিকার, স্পষ্ট লোগো এবং সিকিউরিটি সিল ব্যবহার করে। বিভিন্ন এঙ্গেলে এই লোগো, হলোগ্রাম এবং সিল ঘোরালে রং এবং প্যাটার্ন পরিবর্তন হয়। এছাড়া বোতলের মুখ খুললে ভেতরে ফয়েল সিল দেখা যায়, এতে কোম্পানির লোগো এবং নির্দিষ্ট রঙ থাকে।
৩. কিউআর কোড যাচাই করুন
প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের বেশিরভাগ ইঞ্জিন অয়েল বোতলে কিউআর কোড থাকে। কিউআর কোড স্ক্যান করে ক্যাপের কোড মিলিয়ে আসল কিংবা নকল যাচাই করা যায়।
৪. ব্যাচ নম্বর এবং উৎপাদন তারিখ পরীক্ষা করুন
প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডগুলোর ইঞ্জিন অয়েল বোতলের নিচে কিংবা পাশে ব্যাচ নম্বর এবং উৎপাদন তারিখ খোদাই করা থাকে। এছাড়া অনেক বোতলে লেজার দিয়ে নিখুঁতভাবে উৎপাদন তারিখ এবং ব্যাচ নম্বর লেখা থাকে।
৫. তেলের ঘনত্ব, রং, এবং গন্ধ পরীক্ষা করুন
আসল ইঞ্জিন অয়েলের ঘনত্ব বেশি থাকে। রং সাধারণত সোনালি বা হালকা বাদামি হয়। কোনো ইঞ্জিন অয়েলে তীব্র কিংবা ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে না। তেলে অস্বাভাবিক পাতলা ভাব, স্তর আলাদা হয়ে যাওয়া (সেপারেশন) বা তলানিতে কোন ময়লা থাকলে তা সন্দেহজনক।
লোকাল মার্কেটে নকল স্পেয়ার পার্টস সনাক্ত করার কৌশল
মোটরযানের বিভিন্ন স্পেয়ার পার্টস, যেমন ভুয়া ব্রেক প্যাড, ফিল্টার, স্পার্ক প্লাগ, ক্লাচ প্লেট, ব্যাটারি, লাইট, ইন্ডিকেটর, ইত্যাদি নকল হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে নকলের পাশাপাশি সেকেন্ডহ্যান্ড স্পেয়ার পার্টসও প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।
১. পার্টস নম্বর চেক করুন
মোটরযানের প্রায় সকল স্পেয়ার পার্টসের ইউনিক সিরিয়াল নম্বর থাকে। পার্টস নম্বর, ম্যানুফ্যাকচারারের ওয়েবসাইটের নম্বরের সাথে চেক করুন।
২. অথেনটিসিটি মার্কিং চেক করুন
স্পেয়ার পার্টসের হলোগ্রাফিক লেবেল, প্যাকেজিং, এবং প্রিন্টিং-এ অথেনটিসিটি মার্কিং চেক করুন। নকল পার্টস সাধারণত ওজনে হালকা হয়।
৩. প্যাকেজিং, এবং হলোগ্রাম চেক করুন
প্রায় ব্র্যান্ডের স্পেয়ার পার্টসের প্যাকেজিং, হলোগ্রাম, ইত্যাদি উচ্চমানের হয়। আসল পার্টসের উপাদান মজবুত এবং ফিনিশিং ভালো হয়।
৪. ওয়ার্যান্টি কার্ড চেক করুন
যেসব পার্টসে সাধারণত ওয়ার্যান্টি (থাকে যেমন ব্যাটারি/ইলেক্ট্রনিক্স), সেসব ক্ষেত্রে ওয়ার্যান্টি কার্ড/ইনভয়েস নিশ্চিত করুন।
৫. অনলাইনে কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন
অনলাইনে স্পেয়ার পার্টস কেনার সময় সেলারের রিভিউ দেখুন। থার্ড-পার্টি সেলারের কাছে থেকে স্পেয়ার পার্টস কিনলে ভালোভাবে চেক করে নিন। সবসময় অথোরাইজড বা বিশ্বস্ত আউটলেট থেকে কেনার চেষ্টা করুন।
পরিশেষে
স্থানীয় বাজার থেকে মূল ব্র্যান্ডের অথেনটিক ইঞ্জিন অয়েল ও স্পেয়ার পার্টস কিনুন। সস্তার লোভে নিম্নমানের ইঞ্জিন অয়েল ও ভুয়া স্পেয়ার পার্টস কেনা থেকে বিরত থাকুন। এটি মোটরযানের স্থায়িত্ব কমায়, এবং যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। এছাড়াও বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। অথরাইজড ডিস্ট্রিবিউটর, পাম্প এবং স্টোর থেকে ইঞ্জিন অয়েল এবং স্পেয়ার পার্টস কিনুন। বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিভিন্ন গ্রেডের ইঞ্জিন অয়েল পাওয়া যায়। অসৎ ব্যবসায়ীরা ইঞ্জিন অয়েলে ডিজেল বা অকটেন মিশিয়ে ভেজাল ইঞ্জিন অয়েল তৈরি করেন। সচেতনতাই সর্বোত্তম পন্থা, পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকলে এসব প্রতারণা থেকে বাঁচা সম্ভব।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
১. ভেজাল ইঞ্জিন অয়েল কীভাবে পরীক্ষা করবেন?
প্যাকেজিং, সিল, লোগো এবং প্রিন্টিং দেখুন। কিউআর কোড যাচাই করুন। ব্যাচ নম্বর এবং উৎপাদন তারিখ পরীক্ষা করুন। তেলের ঘনত্ব, রং, এবং গন্ধ পরীক্ষা করুন।
২. নকল স্পেয়ার পার্টস চেনার উপায় কী?
পার্টস নম্বর চেক করুন, অথেনটিসিটি মার্কিং চেক করুন, ওয়ার্যান্টি কার্ড চেক করুন, প্যাকেজিং, এবং হলোগ্রাম চেক করুন। নকল পার্টস সাধারণত ওজনে হালকা হয়।
৩. ইঞ্জিন অয়েলের গন্ধ কেমন?
আসল নতুন ইঞ্জিন অয়েলে হালকা গন্ধ থাকতে পারে, তবে ডিজেল/সলভেন্টের মতো তীব্র গন্ধ থাকলে তা সন্দেহজনক।
৪. ভেজাল ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার মোটরযানের কী ক্ষতি হতে পারে?
ভেজাল বা নিম্নমানের তেল ব্যবহারে ইঞ্জিনে অতিরিক্ত ঘর্ষণে কার্বন জমা হয়, এবং পিস্টন জ্যাম হয়ে গিয়ার শিফটিং হার্ড হয়। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ে, আবার মাইলেজও কমতে থাকে।
৫. আসল ইঞ্জিন অয়েল ও স্পেয়ার পার্টস কোথায় পাওয়া যাবে?
অথরাইজড ডিস্ট্রিবিউটর, পাম্প এবং স্টোর থেকে ইঞ্জিন অয়েল এবং স্পেয়ার পার্টস কিনুন। স্থানীয় বাজার থেকে কিনলে মূল ব্র্যান্ডের অথেনটিক ইঞ্জিন অয়েল ও স্পেয়ার পার্টস কিনুন।






































