মোটরসাইকেল চেইন-স্প্রকেট ক্ষয়ঃ কখনো বদলানো অনিবার্য?

চেইন ও স্প্রকেট বদলানোর আগে আমাদের জানতে হবে, চেইন ও স্প্রকেটের কাজটা আসলে কি। মূলত মোটরসাইকেলের চেইন বা স্প্রকেট ইঞ্জিনের শক্তি সরাসরি চাকায় পৌঁছে দেয়। ধুলা, পানি, কম লুব্রিকেশনের ব্যবহার ও ভুল ভাবে চালানোর মতো কিছু অভ্যাসের কারণে চেইন ও স্প্রকেট ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে যায়। অনেক সময় রাইডাররা প্রাথমিক কিছু লক্ষণ দেখেও তা বিবেচনায় নেয় না। যার ফলে পরবর্তীতে তা বড় সমস্যায় রূপ নেয়। এই ক্ষয় হওয়া চেইন ও স্প্রকেট বাইকের নিয়ন্ত্রণ, গতি এবং নিরাপত্তার উপর খারাপ প্রভাব ফেলে। তাই যখন চেইন ও স্প্রকেট রিপ্লেসমেন্ট করা প্রয়োজন পড়ে, তখন দ্রুতই করে ফেলা উচিত। কখন বদলানো প্রয়োজন, তা জানা থাকলে অনেক দুর্ঘটনা ও অপ্রত্যাশিত খরচ এড়ানো সম্ভব।
জেনে নিন চেইন ও স্প্রকেট বদলানো অনিবার্য হওয়ার ১০টি লক্ষণ
১. স্প্রকেটের দাঁত ধারালো বা বাঁকা হয়ে যাওয়া
যেকোনো ভালো স্প্রকেটের দাঁত সবসময় গোল ও সমান আকৃতির হয়। সময়ের সাথে অতিরিক্ত ব্যবহার করলে দাঁত ধারালো বা একদিকে বাঁকা হয়ে যায়। এতে চেইন ঠিকভাবে বসতে পারে না এবং খুব দ্রুতই ক্ষয় হতে থাকে। এই অবস্থা দেখলে বুঝতে হবে, এটি বদলানো অনিবার্য হয়ে পড়েছে।
২. চেইন বার বার ঢিলা হয়ে যাওয়া
সঠিকভাবে চেইন টান দেওয়ার পরও যদি কিছুদিনের মধ্যেই চেইন আবার ঢিলা হয়ে যায়, বুঝতে হবে চেইন ও স্প্রকেটের ভেতরের অংশ ক্ষয় হয়ে গেছে হয়তো। এক্ষেত্রে শুধু বার বার অ্যাডজাস্ট করেই সমাধান পাওয়া যাবে না।
৩. চালানোর সময় ঝাঁকুনি অনুভব হওয়া
যখন চেইন বা স্প্রকেট ক্ষয় হয়ে যায়, তখন তা ইঞ্জিনের শক্তিকে মসৃণভাবে চাকায় পৌঁছাতে পারে না। ফলে বাইক চালানোর সময় হঠাৎ টান বা ঝাঁকুনি অনুভূত হয়, সবচেয়ে বেশি হয় যখন গতি বাড়ানো হয়। এটাও একটা লক্ষণ যখন আপনার চেইন বা স্প্রকেট বদলাতে হবে।
৪. চেইন থেকে অস্বাভাবিক শব্দ
চেইন বা স্প্রকেট থেকে যদি ঠকঠক, ঘর্ষণ বা খটখট শব্দ আসে, তাহলে সতর্ক হতে হবে। বুঝতে হবে নিশ্চয়ই চেইন বা স্প্রকেটটি ক্ষয় হয়ে গেছে, নাহলে এমন শব্দ আসার কথা-ই না। এই শব্দগুলো মূলত তখন হয় যখন চেইন ও স্প্রকেট ঠিকভাবে একে অপরের সাথে বসতে পারে না।
৫. মরিচা ও শক্ত লিংক দেখতে পাওয়া
মরিচা ধাতুকে দুর্বল করে দেয় এবং চেইনের আয়ু খুব দ্রুত কমিয়ে দেয়। সেই সাথে যদি চেইনের কিছু লিংক শক্ত হয়ে যায়, তাহলে বোঝা যায় ভেতরের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরকম ক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব চেইন পরিবর্তন করে নেওয়াই ভালো।
৬. স্প্রকেট থেকে চেইন সরে যাওয়া
অ্যাক্সিলারেশনের সময় যদি চেইন স্প্রকেটের দাঁত থেকে লাফ দেয়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে বড়ই বিপজ্জনক। এতে হঠাৎ করেই নিয়ন্ত্রণ হারানোর সমূহ সম্ভাবনা থাকে। এই অবস্থায় দেরি না করে দ্রুতই চেইন-স্প্রকেট বদলানো উচিত।
৭. পিছনের স্প্রকেটে অসমভাবে ক্ষয় হলে
পিছনের স্প্রকেটের দাঁত ভাঙা, চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া কিংবা অসমভাবে ক্ষয় হওয়া এগুলো দেখলে বুঝে নিতে হবে, স্প্রকেটের কার্যাকারিতা শেষের দিকে। এমন স্প্রকেট ব্যবহার করা কোনোভাবেই উচিত নয়। এমন স্প্রকেট ব্যবহার করলে চেইনও দ্রুত নষ্ট হয়।
৮. গতি বাড়াতে বিলম্ব হওয়া
অনেক সময় দেখা যায়, ইঞ্জিন স্বাভাবিকভাবেই ঘুরছে কিন্তু বাইক সেই অনুযায়ী গতি বাড়াতে পারছে না, এটা বোঝা যাচ্ছে যে পাওয়ার ট্রান্সফারে সমস্যা হচ্ছে। বেশিরভাগ সময়ই এর কারণ হয় ক্ষয় হওয়া চেইন ও স্প্রকেট।
৯. লুব্রিকেশনেও উন্নতি না হওয়া
সাধারণত আমরা জানি যে লুব্রিকেশন দিলে চেইন মসৃণ হয় এবং চেইনের বাজে শব্দও কমে। কিন্তু লুব্রিকেশন দেওয়ার পরও যদি কোনো উন্নতি না হয়, তাহলে বুঝতে হবে এর ক্ষয় সার্ভিস সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
১০. দীর্ঘদিন বদলানো না হলে
সবকিছুর মতোই চেইন-স্প্রকেটেরও একটি নির্দিষ্ট আয়ু থাকে। অনেকদিন ব্যবহার করলে বা বেশি মাইলেজ চালানো হলে বাহ্যিকভাবে ভালো দেখা গেলেও ভেতরে পার্টস দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তখন এসব পার্টস বিশেষ করে চেইন ও স্প্রকেট বদলানোই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
শেষ কথা
চেইন ও স্প্রকেট বাইকের খুব গুরুত্বপূর্ণ পার্টস। এর ক্ষয় অবহেলা করলে হঠাৎ দুর্ঘটনা ও বড় খরচের ঝুঁকি তৈরি হয়। সময়মতো বদলালে বাইক মসৃণ চলে, শক্তি সঠিকভাবে ট্রান্সফার হয় এবং দীর্ঘমেয়াদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
১. শুধু চেইন অথবা শুধু স্প্রকেট বদলানো যাবে?
না। যেহেতু একটি নতুন অংশ পুরোনো অংশের সাথে ঠিকভাবে কাজ করে না, তাই বিশেষজ্ঞদের মতে দুটো একসাথে বদলানোই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর।
২. চেইন-স্প্রকেট সাধারণত কতদিন টেকে?
চেইন ও স্প্রকেটের টিকে থাকা অনেকটাই নির্ভর করে চালানোর স্টাইল ও রক্ষণাবেক্ষণের উপর। তবে সাধারণত দেখা যায় নতুন লাগানোর পর ২০,০০০-৩০,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত টিকে।
৩. ক্ষয় হওয়া স্প্রকেট চালানো কি ঝুঁকিপূর্ণ?
হ্যাঁ, অবশ্যই। ক্ষয় হওয়া স্প্রকেট চালালে চেইন ছিঁড়ে যাওয়া কিংবা স্প্রকেটের দাঁত থেকে চেইন লাফ দেওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।
৪. বৃষ্টিতে চালালে কি চেইন ও স্প্রকেটের ক্ষয় বাড়ে?
হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে বাড়ে। পানি ও কাঁদা চেইনের লুব্রিকেশন ধুঁয়ে ফেলে। এতে চেইনে মরিচা ধরে ও ক্ষয় দ্রুত বাড়ে।
৫. নিয়মিত লুব্রিকেশন ব্যবহার করে কি চেইন ও স্প্রকেট না বদলালেও চলবে?
না। কারণ লুব্রিকেশন মূলত চেইন ও স্প্রকেটের আয়ু বাড়ায় কিন্তু সেটা আজীবনের জন্য নয়। একসময় চেইন-স্প্রকেট বদলানো অনিবার্য হয়ে যায়।







































