দৈনন্দিন ছোট যাত্রায় জ্বালানি অপচয় কীভাবে কমানো যায়

অফিস, স্কুল, বাজার সহ দৈনন্দিন স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতে অনেকেই গাড়ি বা মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। স্বল্প দূরত্ব যাতায়াতে জ্বালানি অপচয় বেশি হয়, তাই যাতায়াত খরচও বাড়ে। শর্ট ট্রিপে ইঞ্জিন ভালোভাবে গরম হবার সময় পায় না, এতে ফুয়েল কনজাম্পশন এবং কার্বন নিঃসরণ স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়ে। কিছু সহজ কৌশল মেনে চললে জ্বালানি অপচয় অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এই ব্লগে দৈনন্দিন শর্ট ট্রিপে জ্বালানি অপচয় কীভাবে কমানো যায়, সে বিষয়ে বাস্তবসম্মতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
জ্বালানির দাম গত এক দশকের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অতিরিক্ত ফুয়েল কনজাম্পশনের কারণে পরিবেশ বিপর্যয়ও ক্রমাগত বাড়ছে। সাধারণ কিছু অভ্যাসের পরিবর্তন, প্রস্তুতি, সচেতনতা এবং সঠিক মেইন্টেন্যান্সের মাধ্যমে জ্বালানি অপচয় কমানো সম্ভব।
প্রতিদিনের স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় জ্বালানি অপচয় কমানোর উপায়
সাধারণত ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরত্বকে আমরা শর্ট ট্রিপ বলতে পারি। শর্ট ট্রিপে ইঞ্জিন পুরোপুরি গরম হবার আগেই গাড়ি বা মোটরসাইকেল গন্তব্যে পৌঁছায়, তাই এই সময় জ্বালানি খরচ কিছুটা বেশি হয়। এছাড়া ট্রাফিক জ্যামের কারণে ইঞ্জিন আইডল করে রাখা, ঘন ঘন স্টার্ট-স্টপ করা, অযথা স্পিডে চালানো, বিনা প্রয়োজনে এসি চালু রাখা, ইত্যাদি অভ্যাসের কারণে জ্বালানি অপচয় বাড়ে।
১. সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা
স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের কাজে বারবার গাড়ি বা মোটরসাইকেল বের না করে, সঠিকভাবে পরিকল্পনা করুন। বারবার গাড়ি বের না করে, এক ট্রিপে সব কাজ সেরে নিন। সব কাজ পরিকল্পনা করে, একবারে করার চেষ্টা করুন। সম্ভব হলে সকালে বাচ্চার স্কুল, বাজার সদাই এবং অফিস কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত এক ট্রিপে সেরে ফেলুন। আলাদা আলাদা করে শর্ট ট্রিপে বের হলে, ইঞ্জিন পুরোপুরি গরম হয় না। ঠান্ডা ইঞ্জিন বারবার স্টার্ট দিলে জ্বালানি খরচ বেশি হয়।
২. প্রত্যেকবার ইঞ্জিন প্রি-হিটিং করা থেকে বিরত থাকুন
বাংলাদেশে অতিরিক্ত ঠান্ডা পড়ে না। তাই প্রত্যেকবার গাড়ি বা মোটরসাইকেল স্টার্ট করার পর ইঞ্জিন প্রি-হিটিং করা থেকে বিরত থাকুন। ইঞ্জিন চালু করে বেশিক্ষণ নিষ্ক্রিয় করে রাখলে জ্বালানি অপচয় হয়। গাড়ি বা বাইক স্টার্ট করে প্রথমে অল্প স্পিডে ১ থেকে ২ কিমি চালালে ইঞ্জিন ভালো থাকবে। তবে গাড়ি বা মোটরসাইকেল দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত থাকলে ইঞ্জিন প্রি-হিটিং করতে হবে।
৩. অতিরিক্ত ওজন কমাতে হবে
অতিরিক্ত ওজন গাড়ি কিংবা মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলে জ্বালানি বেশি পুড়তে থাকে, এতে জ্বালানি অপচয় হয়। ছোট ট্রিপে গাড়ি থেকে বাড়তি ওজন সরিয়ে ফেলুন। মোটরসাইকেলে ভারী বডিকিট লাগাবেন না।
৪. টায়ার প্রেশার ঠিক রাখুন
টায়ারে বাতাসের প্রেশার কম থাকলে চাকার রোলিং রেজিস্ট্যান্স বেড়ে যায়, ফলে ইঞ্জিনে বেশি চাপ পরে। এতে জ্বালানি অপচয় হয়। গাড়ি বা মোটরসাইকেলের ম্যানুয়ালে প্রস্তাবিত মেজারমেন্ট অনুযায়ী টায়ার প্রেশার নিয়মিত চেক করুন।
৫. যথাসম্ভব ইঞ্জিনের অলস অবস্থা এড়ানোর চেষ্টা করুন
বেশি জ্যামে গাড়ি বা বাইক স্থির দাঁড়িয়ে থাকলে ইঞ্জিন বন্ধ করে রাখুন। ইঞ্জিন আইডলিং জ্বালানি অপচয় বাড়ায়। এখনকার আধুনিক টেকনোলজির গাড়ি এবং মোটরসাইকেলগুলো ইঞ্জিন স্টার্টে খুব কম জ্বালানি খরচ করে।
৬. এসি ব্যবহারে সচেতন হোন
শর্ট ট্রিপে প্রয়োজন না হলে এসি ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। এসি ব্যবহারের প্রয়োজন হলে ফুল পাওয়ারে চালানো থেকে বিরত থাকুন। প্রথমে ইঞ্জিন স্টার্ট করে গাড়ির জানালার কাঁচ নামিয়ে ভেতরের গরম বাতাস বের করে দিন। এরপর ১ থেকে ২ কিলোমিটার স্বাভাবিক স্পিডে চালানোর পর এসি চালু করুন। গাড়ি পার্ক করার অল্প কিছুক্ষণ আগে এসি বন্ধ করুন।
৭. স্বাভাবিক স্পিডে ড্রাইভ করুন
স্বাভাবিক স্পিডে ড্রাইভ করলে জ্বালানি অপচয় হয় না। স্পিডে গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালালে এবং হার্ড ব্রেক করলে জ্বালানি দ্রুত শেষ হতে থাকে। স্মুথভাবে অ্যাক্সেলারেটর এবং ব্রেক ব্যবহারের অভ্যাস করুন। ধীরে ধীরে গাড়ি বা বাইকের স্পিড বাড়াবেন। সামনে সিগন্যাল কিংবা স্পিড ব্রেকার থাকলে আগেই অ্যাক্সেলারেটর ছেড়ে দিন।
৮. নির্দিষ্ট সময় পরপর সার্ভিসিং করানো উচিত
গাড়ি বা মোটরসাইকেলের এয়ার ফিল্টার, এবং ফুয়েল ট্যাংক নোংরা থাকলে বেশি জ্বালানি খরচ হয়। এছাড়া স্পার্ক প্লাগে সমস্যা থাকলে এবং নির্ধারিত ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার না করা হলে জ্বালানি অপচয় হয়। পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর গাড়ি বা মোটরসাইকেল সার্ভিসিং করানো উচিত।
এছাড়া ১ থেকে ২ কিলোমিটারের মধ্যে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতে গাড়ি কিংবা বাইক ব্যবহার না করে সাইকেল বা হেঁটে যাওয়ার অভ্যাস করুন। এই অভ্যাস স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, সাথে জ্বালানিও সাশ্রয় হবে।
পরিশেষে
দৈনিক শর্ট ট্রিপে জ্বালানি অপচয় কমানো কঠিন কোনো বিষয় না। কিছু অভ্যাসের পরিবর্তন এবং সচেতন ড্রাইভ, আপনাকে জ্বালানি অপচয় কমাতে সহায়তা করবে। অতিরিক্ত গতিতে ড্রাইভ করা থেকে থাকুন। এতে হার্ড ব্রেকিং করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে না। এই অভ্যাস জ্বালানি অপচয় কমাবে এবং দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও কমবে। গাড়ি এবং মোটরসাইকেল নিয়মিত মেইনটেন্যান্স করা উচিত। বেসিক কিছু সার্ভিসিং শিখে রাখা উচিত। ইঞ্জিন সুরক্ষিত রাখার উপর জোর দিন। টায়ার প্রেশার নিয়মিত চেক করুন। ঘন ঘন ক্লাচ ব্যবহার এবং গিয়ার পরিবর্তন বেশি জ্বালানি কনজিউম করে। গতির সীমার মধ্যে ড্রাইভ করুন। এই সাধারণ নিয়ম এবং অভ্যাস মেনে চললে, জ্বালানি ও অর্থ উভয়ই সাশ্রয় হবে, সাথে পরিবেশ দূষণও কমবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
১. দৈনন্দিন শর্ট ট্রিপে কেন বেশি জ্বালানি অপচয় হয়?
শর্ট ট্রিপে ইঞ্জিন ভালোভাবে গরম হবার সময় পায় না, এতে ফুয়েল কনজাম্পশন এবং কার্বন নিঃসরণ স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়ে। ঠান্ডা ইঞ্জিন দ্রুত গরম করতে তুলনামূলক বেশি জ্বালানি লাগে।
২. স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতে এসি চালালে কী জ্বালানি বেশি খরচ হয়?
কম স্পিডে গাড়ি চালানোর সময় এসি চালালে জ্বালানি বেশি খরচ হয়। তবে ৬০ কিমি/ঘণ্টার বেশি স্পিডে গাড়ি চালালে এসি চালানো সাশ্রয়ী।
৩. ইঞ্জিন চালু অবস্থায় নিষ্ক্রিয় করে রাখলে কী জ্বালানি অপচয় হয়?
বেশি সময় ইঞ্জিন নিষ্ক্রিয় করা হলে জ্বালানি অপচয় হয়। জ্যামে দীর্ঘক্ষণ স্থির থাকলে ইঞ্জিন বন্ধ রাখাই ভালো। গাড়ি কিংবা মোটরসাইকেল দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকলে এবং ঠান্ডা আবহাওয়ায় ৩০-৬০ সেকেন্ড আইডলিং করা যায়, ইঞ্জিন গরম হবার জন্য।
৪. টায়ার প্রেশার কম থাকলে কী জ্বালানি বেশি খরচ হয়?
টায়ারে বাতাসের প্রেশার কম থাকলে চাকার রোলিং রেজিস্ট্যান্স বেড়ে যায়, ফলে ইঞ্জিনে বেশি চাপ পরে। এতে জ্বালানি অপচয় হয়। গাড়ি বা মোটরসাইকেলের ম্যানুয়ালে প্রস্তাবিত মেজারমেন্ট অনুযায়ী টায়ার প্রেশার নিয়মিত চেক করুন।
৫. কিভাবে মেইনটেন্যান্স করলে জ্বালানি অপচয় রোধ করা সম্ভব?
এয়ার ফিল্টার এবং ফুয়েল ট্যাংক নোংরা থাকলে বেশি জ্বালানি খরচ হয়। এছাড়া স্পার্ক প্লাগে সমস্যা থাকলে, টায়ার প্রেশার কম থাকলে এবং নির্ধারিত ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার না করা হলে জ্বালানি অপচয় হয়। সঠিক মেইনটেন্যান্স করলে ফুয়েল এফিশিয়েন্সি বাড়বে।







































