কেন পুরোনো জাপানিজ গাড়ি এখনও বাংলাদেশের ব্যবহৃত গাড়ির বাজার দখল করে আছে

বাংলাদেশের ব্যবহৃত গাড়ির বাজারে একটু ঘুরে দেখলে একটা বিষয় খুব সহজেই বোঝা যায় যে, এই বাজারের বেশিরভাগ অংশ এখনো ব্যবহৃত জাপানিজ গাড়িগুলোর দখলে রয়েছে। টয়োটা, নিসান, হোন্ডা, মিতসুবিশির ১০, ১৫ এমনকি ২০ বছরের পুরোনো মডেলও এখনো নতুন অনেক গাড়ির চেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। বিষয়টি কোনো কাকতালীয় ঘটনা বা ট্রেন্ড নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের ব্যবহৃত গাড়ির বাজারে এই বিষয়টি টিকে রয়েছে। আর এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু বাস্তব ও যুক্তিসংগত কারণ।
আকর্ষণীয় ফিচারের চেয়ে পরীক্ষিত নির্ভরযোগ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ
পুরোনো জাপানিজ গাড়িগুলো বছরের পর বছর ধরে নিজেদের নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণ করেছে। এসব গাড়ি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন কম যত্নেও দীর্ঘদিন ভালোভাবে চলতে পারে। আধুনিক গাড়ির মতো এই গাড়িগুলোতে তেমন একটা জটিল ইলেক্ট্রনিক সিস্টেম বা সেনসিটিভ সেন্সর নেই। কিন্তু বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জিং রোড কোয়ালিটি, ট্রাফিক আর জ্বালানির মানের সাথে এই গাড়িগুলোই ভালো মানিয়ে যায়। তাই মানুষ কাগজে-কলমে ভালো দেখানো ফিচারের চেয়ে এই বহু বছরের পরীক্ষিত অভিজ্ঞতাকেই বেশি প্রাধান্য দেয়।
সহজ ও কম খরচের রক্ষণাবেক্ষণ
পুরোনো জাপানিজ গাড়ির প্রতি মানুষের এই প্রবল ঝোঁকের আরেকটি বড় কারণ হলো রক্ষণাবেক্ষণ খরচ। এসব গাড়ির যন্ত্রাংশ দেশের প্রায় সব জায়গাতেই সহজে পাওয়া যায়। শুধু বড় শহরেই নয়, ছোট শহর বা মফস্বলেও বেশিরভাগ মেকানিক এই গাড়িগুলোর ইঞ্জিন ও মেকানিক্যাল সিস্টেম সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন। বেশিরভাগ মেরামতের জন্য আলাদা কোনো আধুনিক ডায়াগনস্টিক যন্ত্রেরও প্রয়োজন হয় না। ফলে সার্ভিসিং সহজ থাকে এবং খরচও কম হয়। এটি ব্যবহৃত গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে কাজ করে।
দেশের রাস্তার সাথে ভালো মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা
বাংলাদেশের রাস্তাঘাট গাড়ির জন্য মোটেও সহজ নয়। ভাঙা রাস্তা, উঁচু স্পিড ব্রেকার আর বর্ষাকালে পানি জমে থাকা এখানে প্রায় নিয়মিত ঘটনা। পুরোনো জাপানিজ গাড়িগুলোর সাসপেনশন সাধারণত বেশ ভালো মানের হয়, যা এসব পরিস্থিতি ভালোভাবে সামাল দিতে পারে। এই গাড়িগুলো খুব বিলাসবহুল অভিজ্ঞতা না দিলেও দৈনন্দিন ব্যবহারে দ্রুত নষ্টও হয় না। অনেক নতুন মডেলের গাড়ি যেখানে অল্প সময়েই ঝামেলা শুরু করে, সেখানে এই পুরোনো গাড়িগুলো টিকে যায় অনেক বেশি সময়।
বেশ জ্বালানি সাশ্রয়ী
যারা ব্যবহৃত গাড়ি কিনেন, তাদের কাছে জ্বালানির খরচ সর্বদাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পুরোনো জাপানিজ গাড়িগুলো তাদের ইঞ্জিন সাইজ অনুযায়ী বেশ ভালো মাইলেজ দেয়। এগুলোর ইঞ্জিন সাধারণত খুব বেশি টিউন করা হয় না। পারফরম্যান্সের চেয়ে মসৃণ ও ধারাবাহিক জ্বালানি খরচই এখানে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এর ফলে শহরের ভেতরে নিয়মিত ব্যবহারে জ্বালানি খরচ তুলনামূলকভাবে কম হয়।
ভালো রিসেল ভ্যালু
আরেকটি বড় কারণ হলো রিসেল সুবিধা। মানুষ জানে, আজ একটি পুরোনো জাপানিজ গাড়ি কিনে কয়েক বছর চালানোর পরেও সেটি ভালো দামে বিক্রি করা সম্ভব। এতে করে ক্রেতাদের মধ্যে এক ধরনের আস্থার নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। সবাই জানে, এই গাড়িগুলোর চাহিদা সব সময়ই থাকবে। ফলে এখানে নিজের কষ্টার্জিত টাকা বিনিয়োগ করতে মানুষ নিরাপদ মনে করে।
উপসংহার
বাংলাদেশের ব্যবহৃত গাড়ির বাজারে পুরোনো জাপানিজ গাড়ির আধিপত্যের কারণ একেবারেই বাস্তবিক। নির্ভরযোগ্যতা, কম রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, খারাপ রাস্তায় টিকে থাকার ক্ষমতা, জ্বালানি সাশ্রয় আর ভালো রিসেল ভ্যালু, সব মিলিয়ে এগুলো সাধারণ ক্রেতার প্রয়োজনের সাথে পুরোপুরি মানানসই। আধুনিক প্রযুক্তি বা ঝকঝকে ফিচার না থাকলেও, এসব গাড়ি দেয় তার চেয়েও মূল্যবান একটি জিনিস, তা হলো মানসিক নিশ্চয়তা। আর যেখানে ব্যবহারিক দিকটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে পুরোনো জাপানিজ গাড়িই বারবার এগিয়ে থাকে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
১. নতুন গাড়ির বদলে মানুষ কেন পুরোনো জাপানিজ গাড়ি পছন্দ করে?
কারণ এই গাড়িগুলো নির্ভরযোগ্য, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম এবং দেশের রাস্তাঘাটের সাথে বেশ মানিয়ে যায়।
২. এসব গাড়ির যন্ত্রাংশ কি সহজে পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, দেশের প্রায় সব জায়গায় এসব গাড়ির যন্ত্রাংশ পাওয়া যায় এবং বেশিরভাগ মেকানিক এই গাড়িগুলোতে অভ্যস্ত।
৩. পুরোনো জাপানিজ গাড়ি কি কম জ্বালানী খরচ করে?
হ্যাঁ। বিশেষ করে শহরের ভেতরে চলাচলের ক্ষেত্রে এগুলো স্থির ও অনুমানযোগ্য মাইলেজ দেয়।
৪. খারাপ রাস্তায় কি এই গাড়িগুলো ভালো চলে?
হ্যাঁ, ভালো সাসপেনশন ও ভালো বিল্ড কোয়ালিটির কারণে ভাঙা রাস্তায় এগুলো তুলনামূলক ভালো পারফর্ম করে।
৫. বাংলাদেশে কি এসব গাড়ির রিসেল ভ্যালু ভালো?
হ্যাঁ, পুরোনো জাপানিজ গাড়ির চাহিদা বেশি থাকায় এগুলোর রিসেল ভ্যালু এখনো বেশ ভালো।

































