রোড ট্রিপ চেকলিস্টঃ শহরের বাইরে লং ড্রাইভের আগে কী কী চেক করবেন

একঘেঁয়ে যান্ত্রিক জীবন থেকে বাঁচতে ভ্রমণ একটি কার্যকর সমাধান। খোলা রাস্তায় রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার কিংবা পাহাড়-নদী ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশ, মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। তবে দীর্ঘ রোড ট্রিপ কিংবা শহরের বাইরে লং ড্রাইভের পরিকল্পনা করলে কিছু প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন। যাত্রা পথে বাহনের ইঞ্জিন বিকল হতে পারে, জ্বালানি ফুরিয়ে যেতে পারে, টায়ার পাঙ্কচার হতে পারে, এছাড়াও, বাহনের কাগজপত্র আপডেটেড না থাকলে আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন। তাই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না নিলে আনন্দের ভ্রমণ নিমেষেই মাটি হয়ে যেতে পারে।
আপনার মোটরযানের কন্ডিশন, ব্রেকিং সিস্টেম, টায়ার, ব্যাটারি, ফার্স্ট এইড কিট, গেজেটস, শুকনো খাবার, লিগ্যাল ডকুমেন্টস, ইত্যাদি বিষয়গুলো দীর্ঘ ভ্রমণের আগে চেক করা জরুরি। এই ব্লগে শহরের বাইরে দীর্ঘ ড্রাইভে বের হওয়ার আগে যা যা অবশ্যই চেক করবেন, সেসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
শহরের বাইরে দীর্ঘ রোড ট্রিপের আগে করণীয়
১. মোটরযানের ইঞ্জিন কন্ডিশন চেক করুন
মোটরযানের ইঞ্জিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইঞ্জিনের যেকোনো সমস্যা হলে, তা বের করতেও সময় লাগে, অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুলও। তাই রোড ট্রিপ কিংবা লং ড্রাইভে যাবার আগে মোটরযানের ইঞ্জিন পেশাদার মেকানিকের সাহায্যে চেক করুন। ইঞ্জিন অয়েল, কুল্যান্ট লেভেল, এসি ইত্যাদি চেক করুন। ইঞ্জিন ওভারহিট হয় কিনা চেক করুন। ব্রেক ফ্লুইড লেভেল ঠিক না থাকলে ব্রেক ফেল হতে পারে।
২. টায়ার প্রেসার চেক করুন
টায়ার প্রেসার এবং গ্রিপ ঠিক না থাকলে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। টায়ারের ট্রেড গভীরতা পরীক্ষা করুন। টায়ার ক্ষয়ে গেলে বৃষ্টি, কাদা এবং পাহাড়ি রোডে স্লিপ করতে পারে। বাহনের ম্যানুয়ালে উল্লেখিত মেজারমেন্টে টায়ারে বাতাস পাম্প করুন। কারণ অতিরিক্ত কিংবা অল্প প্রেসার উভয়ই হাইওয়ে রোডে ক্ষতিকর।
৩. ব্রেকিং সিস্টেম চেক করুন
দীর্ঘ রোড ট্রিপে ব্রেকিং সিস্টেম টপ নচ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সন্দেহ থাকলে পেশাদার মেকানিকের সাহায্য নিন। ব্রেক করার সময় অস্বাভাবিক শব্দ হলে কিংবা বেশি ধাক্কা অনুভব হলে, সার্ভিসিং করানো উচিত। ব্রেক প্যাড এবং ডিস্ক ব্রেক চেক করুন। ব্রেক প্যাড পাতলা হয়ে গেলে পরিবর্তন করুন।
৪. ব্যাটারি হেলথ চেক করুন
দীর্ঘ ভ্রমণে ব্যাটারি কারণে গাড়ি বন্ধ হয়ে গেলে বড় ঝামেলায় পড়বেন। ভ্রমণের বের হবার ১-২ দিন আগেই ব্যাটারির ভোল্টেজ ও কন্ডিশন চেক করুন। ব্যাটারি পুরোনো হয়ে গেলে পরিবর্তন করাই ভালো। ব্যাটারির টার্মিনাল এবং ক্যাবল পরীক্ষা করুন, পরিষ্কার করে সংযোগ ঠিক ভাবে অ্যাডজাস্ট করুন।
৫. লাইটিং সিস্টেম চেক করুন
দীর্ঘ ভ্রমণে গেলে রাতের বেলাও ড্রাইভ করা লাগতে পারে। তাই হেড লাইট, টেইল লাইট, টার্ন ইনডিকেটর ইত্যাদি চেক করুন। লাইট শুধু নিজের নিরাপত্তার জন্যই নয়, অন্যান্য বাহন এবং পথচারীদের নিরাপত্তার জন্যও জরুরি। এছাড়া বৃষ্টি এবং খারাপ আবহাওয়াতেও ভালো একটি লাইটিং সিস্টেম খুবই দরকার। ভ্রমণে বের হবার আগে বাল্ব, লেন্স, হাই-লো বিম, এবং ব্রেক লাইট চেক করুন।
৬. ফার্স্ট এইড কিট সাথে রাখুন
ফার্স্ট এইড বক্সে প্রয়োজনীয় ওষুধ, ব্যক্তিগত নিয়মিত ওষুধ, এন্টিসেপটিক, স্যাভলন, থার্মোমিটার, ব্যান্ডেজ, স্যানিটাইজার, ইত্যাদি নিন। প্রয়োজনে ব্যথার ওষুধ, মোশন সিকনেস ট্যাবলেট, মাস্ক, এরোসল, কাঁচি, ইত্যাদি রাখতে পারেন।
৭. ওয়াইপার এবং উইন্ডশিল্ড চেক করুন
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ওয়াইপার এবং উইন্ডশিল্ড খুব দরকারি। কুয়াশা কিংবা বৃষ্টিতে ওয়াইপার কাজে লাগে। তবে বাংলাদেশের রাস্তায় প্রচুর ধুলা-বালি থাকে, তাই ওয়াইপার ব্লেড দ্রুত ক্ষয় হয়ে যায়। ভ্রমণে বের হবার আগে ওয়াশার ট্যাংক পূর্ণ করে নিন। উইন্ডশিল্ড পরিষ্কার রাখুন।
৮. লিগ্যাল ডকুমেন্টস আপডেটেড রাখুন
মোটরযানের লিগ্যাল ডকুমেন্টস এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স অবশ্যই সাথে রাখতে হবে। ভ্রমণে যাবার আগেই বাহনের ব্লুবুক, রেজিস্ট্রেশন পেপার, ইন্স্যুরেন্স পেপার, ফিটনেস সার্টিফিকেট, ট্যাক্স টোকেন, ইত্যাদি হালনাগাদ করে রাখুন।
৯. জরুরি কিছু টুলকিট সাথে রাখুন
জাম্পার কেবল, হুইল স্প্যানার, রিচার্জেবল টর্চ, পেন্সিল ব্যাটারি, রেইনকোট, ছাতা, এক্সট্রা ক্যাবল, এক্সট্রা ফিউজ, এক্সট্রা ইঞ্জিন অয়েল, ডাক্ট টেপ, বেসিক মেকানিক্যাল টুলসেট, স্ক্রু ড্রাইভার সেট, ইত্যাদি যা প্রয়োজন বাহনের সাথে রাখুন।
১০. শুকনো খাবার এবং ব্যক্তিগত জিনিস সাথে রাখুন
দীর্ঘ ভ্রমণে শুকনো খাবার এবং পানি সাথে রাখুন। বিস্কুট, চকলেট, স্যালাইন, গ্লুকোজ, বাদাম, ইত্যাদি শুকনো খাবার সাথে রাখতে পারেন। কিছু ব্যক্তিগত জিনিস যেমন, পাওয়ার ব্যাঙ্ক, মাল্টি-প্লাগ, সানগ্লাস, টিস্যু, ইত্যাদি সাথে রাখতে পারেন।
কিছু এক্সট্রা টিপস
মাঝ রাস্তায় হঠাৎ ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেলে, তৎক্ষণাৎ মেকানিক পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে কিছু মেকানিক্যাল জ্ঞান জানা থাকলে সাধারণ সমস্যা আপনি নিজেই সারাতে পারবেন। প্রয়োজনে রোড ট্রিপের আগেই আপনার মোটরযান সার্ভিসিং করুন।
- একটি স্পেয়ার টায়ার সাথে রাখুন।
- জ্যাক, রেঞ্চ ও টায়ার রিপেয়ার কিট সাথে রাখুন।
- বাহনের হর্ন চেক করুন।
- গাড়ি লক-আনলক টেস্ট করুন।
- এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম চেক করুন।
- দীর্ঘ ভ্রমণে নেভিগেশন অন রাখুন।
- সিটবেল্ট এবং হোস পরীক্ষা করুন।
- কয়েক ঘন্টা পর পর অন্তত ১৫ মিনিট বিশ্রাম নিন।
- রিফ্লেক্টিভ জ্যাকেট, টায়ার ইনফ্লেটর বা পাম্প এবং রিফ্লেকটিভ ট্রায়াঙ্গেল রাখতে পারেন, কোথাও আটকা পড়লে কাজে লাগবে।
পরিশেষে
যাত্রাপথে সাধারণ কোনো সমস্যা আপনার আনন্দকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করতে পারে। কিছু সময় হাতে নিয়ে বাহনের ইঞ্জিন থেকে শুরু করে জরুরি কাগজপত্র পর্যন্ত সবকিছু তালিকা ধরে চেক করুন। যত্ন সহকারে প্রস্তুতি আপনার ভ্রমণকে স্মরণীয় এবং উপভোগ্য করে তুলবে। এই চেকলিস্ট আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে দীর্ঘ ভ্রমণে যাত্রাপথে অপ্রত্যাশিত বিপদ থেকে রক্ষা করবে, এবং ভ্রমণকে রোমাঞ্চকর করবে। আশা করি, লং ড্রাইভ কিংবা রোড ট্রিপে যাওয়ার আগে এই চেকলিস্টটি আপনাকে আত্মবিশ্বাসী করবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
১. রোড ট্রিপ কিংবা লং ড্রাইভের আগে মোটরযানের কী কী বিষয় অবশ্যই চেক করতে হবে?
ইঞ্জিন কন্ডিশন, টায়ার প্রেশার, ব্রেক সিস্টেম, ব্যাটারি কন্ডিশন, লাইটিং সিস্টেম, ফার্স্ট এইড কিট, লিগ্যাল ডকুমেন্টস, ইত্যাদি অবশ্যই চেক করতে হবে।
২. লং ড্রাইভে যাবার আগে টায়ার কীভাবে চেক করবেন?
টায়ারের ট্রেড গভীরতা পরীক্ষা করুন। টায়ার ক্ষয়ে গেলে বৃষ্টি, কাদা এবং পাহাড়ি রোডে স্লিপ করতে পারে। বাহনের ম্যানুয়ালে উল্লেখিত মেজারমেন্টে টায়ারে বাতাস পাম্প করুন।
৩. রোড ট্রিপ কিংবা লং ড্রাইভে মোটরযানের সাথে কী কী জরুরি টুলকিট রাখবেন?
জাম্পার কেবল, হুইল স্প্যানার, রিচার্জেবল টর্চ, পেন্সিল ব্যাটারি, রেইনকোট, ছাতা, এক্সট্রা ক্যাবল, এক্সট্রা ফিউজ, এক্সট্রা ইঞ্জিন অয়েল, ডাক্ট টেপ, বেসিক মেকানিক্যাল টুলসেট, ইত্যাদি বাহনের সাথে রাখুন।
৪. দীর্ঘ ভ্রমণে ফার্স্ট এইড কিটে কী কী জিনিস থাকা উচিত?
ফার্স্ট এইড বক্সে প্রয়োজনীয় ওষুধ, ব্যক্তিগত নিয়মিত ওষুধ এন্টিসেপটিক, স্যাভলন, ব্যান্ডেজ, স্যানিটাইজার, ইত্যাদি নিন। প্রয়োজনে ব্যথার ওষুধ, মোশন সিকনেস ট্যাবলেট, মাস্ক, এরোসল, ইত্যাদি রাখতে পারেন।
৫. মোটরযানের সাথে কী কী লিগ্যাল ডকুমেন্টস রাখবেন?
ভ্রমণে যাবার আগেই বাহনের ব্লুবুক, রেজিস্ট্রেশন পেপার, ইন্স্যুরেন্স পেপার, ফিটনেস সার্টিফিকেট, ট্যাক্স টোকেন, ইত্যাদি হালনাগাদ করে রাখুন।







































