ব্যবহৃত মোটরসাইকেল কেনার গাইডঃ মাইলেজ ছাড়াও আর কী কী দেখবেন?

ব্যবহৃত মোটরসাইকেল কিনতে গেলে অনেকেই শুধু মাইলেজ দেখেন। কিন্তু শুধু মাইলেজ দেখে বাইকের প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায় না। মাঝে মাঝে দেখা যায়, মাইলেজ কম, কিন্তু যথাযথ যত্নের অভাবে বাইকের বিভিন্ন পার্টস নষ্ট। আবার অনেক বেশি মাইলেজ হলেও ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বাইক ভালো পারফরম্যান্স দিচ্ছে। তাই বাইক কেনার আগে মাইলেজ বাদেও বাইকের ইঞ্জিন, বডি, কাগজপত্র ও চালানোর অভিজ্ঞতা ইত্যাদি ভালোমতো যাচাই করা জরুরি। এতে যেমন ভবিষ্যতের ঝামেলা কমে, তেমনি বাড়তি খরচও কমে।
মাইলেজ ছাড়াও যেসব বিষয় যাচাই করা জরুরি
১. ইঞ্জিনের শব্দ ও মসৃণতা
ইঞ্জিন চালু করেই বাইক চালানো শুরু করবেন না। ইঞ্জিনের শব্দ কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শুনুন। শব্দ যেন একটানা ও মসৃণ হয়। ঠকঠক শব্দ, হঠাত কাঁপুনি বা অতিরিক্ত আওয়াজ থাকলে বুঝতে হবে ইঞ্জিনের ভেতর সমস্যা থাকতে পারে।
২. এক্সহস্ট থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে কিনা
বাইক স্টার্ট করার সময় এবং হাল্কা রেভ দেওয়ার সময় খেয়াল করুন এক্সহস্টের ধোঁয়ার রঙ কেমন। নীল ধোঁয়া তেল পোড়ার ইঙ্গিত দেয়। আবার কালো ধোঁয়া জ্বালানি সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
৩. ক্লাচ ও গিয়ার ঠিকভাবে কাজ করছে কিনা
গিয়ার পরিবর্তনের সময় খেয়াল রাখতে হবে গিয়ার পরিবর্তন যেন সহজেই করা যায় এবং গিয়ার যেন মসৃণ হয়। ক্লাচ ছেড়ে দেওয়ার পর বাইক যদি ঠিকভাবে না চলে কিংবা ক্লাচ যদি স্লিপ করে, তবে সাবধান হতে হবে। কারণ, যদি ক্লাচ স্লিপ করে, তাহলে ভবিষ্যতে বড় মেরামতের প্রয়োজন হতে পারে।
৪. ফ্রেম ও চ্যাসিসের অবস্থা
বাইকের ফ্রেম খুব ভালোভাবে দেখুন। ফ্রেমে বা চ্যাসিসে ফাটল বা অস্বাভাবিক ওয়েল্ডিং চিহ্ন থাকলে সেটি পূর্ব দুর্ঘটনার ইঙ্গিত হতে পারে। নিরাপত্তার জন্য এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
৫. সাসপেনশন ও রাইডের আরাম
যখন সাসপেনশন দেখবেন, তখন খেয়াল করবেন, সামনের ও পেছনের সাসপেনশন চাপ দিলে তা যেন মসৃণভাবে কাজ করে। রাইড করার সময় বাইক যদি বেশি দুলে বা আপনার অস্থির লাগে, তাহলে বুঝতে হবে কোনো না কোনো সাসপেনশনে সমস্যা থাকতে পারে।
৬. ব্রেকের কার্যকারিতা
ব্রেকের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি খেয়াল করতে হবে, তা হলো, ব্রেক চাপ দিলে বাইক দ্রুত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে থামা উচিত। ব্রেক করার সময় বাইকের কোনো কাঁপুনি, অপ্রয়োজনীয় শব্দ হলে কিংবা বাইক দেরিতে কাজ করলে বোঝা যায় এটি বাইকারের অবহেলার কারণে হয়েছে।
৭. চেইন, স্প্রকেট ও টায়ারের অবস্থা
চেইন ও স্প্রকেটে অতিরিক্ত ক্ষয়, মরিচা বা ঢিলা ভাব আছে কিনা দেখতে হবে। এছাড়াও টায়ারের গ্রিপের ক্ষেত্রে যদি ভালো গ্রিপ না হয়, বাইক চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠে।
৮. ইলেকট্রিক্যাল অংশগুলো পরীক্ষা করুন
হেডলাইট, ইন্ডিকেটর, হর্ন ও সেল্ফ স্টার্ট ঠিকভাবে কাজ করছে কিনা তা পরীক্ষা করুন। ইলেকট্রিক সমস্যা অনেকেই ছোট মনে করেন। তবে এগুলো ছোট মনে হলেও, পরবর্তীতে দৈনন্দিন ব্যবহারে তা বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৯. সার্ভিস হিস্ট্রি ও কাগজপত্র
অবশ্যই রেজিস্ট্রেশন, ইঞ্জিন নম্বর ও চ্যাসিস নম্বর মিলিয়ে নিবেন। কাগজপত্রে সমস্যা থাকলে ভবিষ্যতে আইনি ঝামেলা হতে পারে।
১০. টেস্ট রাইড
বাইক কেনার আগে একটি টেস্ট রাইড দিতে ভুলবেন না। টেস্ট রাইডের সময় বাইক চালাতে স্বস্তি ও আরামদায়ক লাগা উচিত। এমন অনেক কিছু আছে খালি চোখে দেখা যায় না, টেস্ট রাইডের সময় ধরা পড়ে। যদি অস্বাভাবিক কিছু মনে হয়, তাহলে সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে আবার ভাবুন বাইকটি কি কেনার উপযোগী কি না।
শেষ কথা
শুধু মাইলেজ দেখে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল কেনা ঠিক না। ভালোভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নিলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। তাই সময় নিয়ে যাচাই বাছাই করে ভালো বাইকটি কিনুন। এতে খরচও বাঁচবে, ভবিষ্যতে ঝামেলাও এড়ানো যাবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
১. কম মাইলেজ কি সবসময় ভালো লক্ষণ?
না, শুধু কম মাইলেজ মানেই ভালো বাইক নয়। যদি বাইকের যত্ন ঠিকভাবে না নেওয়া হয়, তাহলে কম চালানো বাইকেও অনেক বড় সমস্যা থাকতে পারে।
২. টেস্ট রাইড কি করা উচিত?
অবশ্যই। টেস্ট রাইডের মাধ্যমে খালি চোখে যেগুলো দেখা যায়না সেই সমস্যাও বুঝা যায়। টেস্ট রাইড নিলে ইঞ্জিন, গিয়ার, ব্রেক ইত্যাদি সব বিষয়েই সামগ্রিক অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়, যা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
৩. কাগজপত্র কেনো এত গুরুত্বপূর্ণ?
ব্যবহৃত বাইকের কাগজপত্র অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভুল বা অসম্পূর্ণ কাগজপত্র ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। সঠিন কাগজ থাকলে মালিকানা ও ব্যবহার নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয় না।
৪. বাইকের বাহ্যিক অবস্থা দেখে কি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়?
না। বিশেষজ্ঞরা সবসময় পরামর্শ দেন, বাইকের বাহ্যিক দিক দেখেই কেবল বাইক কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বাইক দেখতে চকচকে হলেও, ভেতরের যন্ত্রাংশে সমস্যা থাকতে পারে। তাই বাইরের চেয়ে ভেতরের দিক ভালোভাবে পরীক্ষা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উত্তম।
৫. মেকানিক দিয়ে দেখানোর প্রয়োজন আছে কি?
হ্যাঁ, ক্ষেত্রবিশেষে দরকার হয়। কারণ আপনি সাধারণ বাইকার হিসেবে বাইকের ভেতরের অনেক কিছুই বুঝতে পারবেন না। অভিজ্ঞ মেকানিক এমন অনেক কিছুই সহজে ধরে ফেলতে পারে।







































